insurancejobsbd@gmail.com শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩

মিস-সেলিংয়ের ফাঁদ ও পেশাদারিত্ব: দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার গড়তে সততার গুরুত্ব


প্রকাশিত: ১৪ আগষ্ট ২০২৬, ১০:১২

মো. তোফাজ্জেল হোসাইন (মানিক): বীমা পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অনেকেই এই শিল্পে যুক্ত হন। কিন্তু সবার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো 'মিস-সেলিং' (Mis-selling) বা ভুল তথ্য দিয়ে পলিসি বিক্রি করার প্রবণতা। মাস শেষে টার্গেট পূরণের চাপ বা দ্রুত বেশি কমিশন আয়ের লোভে অনেক ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাসোসিয়েট (এফএ) গ্রাহককে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসেন।

সাময়িকভাবে এটি লাভজনক মনে হলেও, আদতে এটি এমন একটি ফাঁদ যা একজন কর্মীর ক্যারিয়ার এবং কোম্পানির রেপুটেশন- দুটোই ধ্বংস করে দেয়।

বীমা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার গড়তে সততা ও পেশাদারিত্ব কেন কোনো বিকল্প নয়, চলুন তা বিশ্লেষণ করি:

১. মিস-সেলিং কী এবং কেন এটি একটি ফাঁদ?

পলিসির মেয়াদ, বোনাসের পরিমাণ, সারেন্ডার ভ্যালু বা ক্লেইম পাওয়ার শর্তাবলি সম্পর্কে গ্রাহককে ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়াই হলো মিস-সেলিং। একজন গ্রাহক হয়তো আপনার কথায় বিশ্বাস করে পলিসিটি কিনলেন, কিন্তু যখন তিনি প্রকৃত সত্য জানতে পারেন (বিশেষ করে মেয়াদপূর্তি বা ক্লেইমের সময়), তখন তিনি শুধু পলিসিই বাতিল করেন না, বরং ওই এফএ এবং কোম্পানির ওপর চিরতরে আস্থা হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত আয়ের এই শর্টকাট পথটি মূলত নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল।

২. আস্থার সংকট: একবার বিশ্বাস ভাঙলে তা আর জোড়া লাগে না

বীমা কোনো দৃশ্যমান পণ্য নয়; এটি একটি 'প্রতিশ্রুতি' এবং 'বিশ্বাস'। গ্রাহক আপনার সততার ওপর ভরসা করে তার কষ্টার্জিত অর্থ বছরের পর বছর জমা রাখেন। যখন সেই বিশ্বাস ভেঙে যায়, তখন তা আর কোনোভাবেই জোড়া লাগানো সম্ভব হয় না। একজন অসন্তুষ্ট গ্রাহক তার নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা আরও দশজনকে জানান, যা আপনার ভবিষ্যৎ ব্যবসার সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

৩. কোম্পানির ব্র্যান্ড ইমেজ ও সমগ্র শিল্পের ক্ষতি

একজন মাঠকর্মী হলেন কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি। আপনার একটি মিথ্যা কথা বা ভুল তথ্যের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কোম্পানির কাঁধেই বর্তায়। বাজারে কোম্পানির দুর্নাম ছড়ায়। শুধু তাই নয়, এ ধরনের অপেশাদার আচরণের কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, যা এই শিল্পের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা।

৪. রেফারেল ব্যবসার মৃত্যু

বীমা পেশায় সবচেয়ে সফল তারাই, যারা 'রেফারেল' বা পরিচিতদের সুপারিশের মাধ্যমে ব্যবসা পান। আপনি যদি সততার সাথে, সঠিক নিড অ্যানালাইসিস করে গ্রাহককে পলিসি দেন এবং মেয়াদজুড়ে তাকে সঠিক সেবা প্রদান করেন, তবে ওই সন্তুষ্ট গ্রাহকই আপনাকে আরও নতুন ক্লায়েন্ট এনে দেবেন। অন্যদিকে, মিস-সেলিং করলে আপনার রেফারেল ব্যবসার সম্ভাবনা সেখানেই মারা যায়।

৫. আইনি ও পেশাগত ঝুঁকি

বর্তমান সময়ে গ্রাহকরা অনেক বেশি সচেতন এবং বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইডিআরএ) অত্যন্ত কঠোর। মিস-সেলিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু যে পলিসি বাতিল বা কমিশন ফেরত দিতে হয় তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল বা চাকরি হারানোর মতো আইনি ও পেশাগত শাস্তির মুখেও পড়তে হয়।

পেশাদারিত্ব ও সততা: দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের রক্ষাকবচ

বীমা পেশায় 'সততা' কেবল একটি নৈতিক বিষয় নয়, এটি একটি স্ট্র্যাটেজিক বিজনেস টুল। আপনি যদি গ্রাহককে স্পষ্টভাবে পলিসির সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতা—উভয় দিকই বুঝিয়ে বলেন, তবে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দু-একটি পলিসি বিক্রি নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আপনি একজন নির্ভরযোগ্য 'ফিন্যান্সিয়াল কনসালটেন্ট' হিসেবে পরিচিতি পাবেন।

সর্বোপরি, সাময়িক লাভের মোহ ত্যাগ করে পেশাদারিত্বের পথে হাঁটুন। গ্রাহকের প্রয়োজন বুঝুন, সঠিক তথ্য দিন এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, সত্য বলে একটি পলিসি বিক্রি করতে না পারার চেয়ে, মিথ্যা বলে পলিসি বিক্রি করা ক্যারিয়ারের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। সততার ভিত্তিতে গড়া ক্যারিয়ারই হয় সবচেয়ে মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী।

লেখক: হেড অব ট্রেনিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি।

এমএসএস

সম্পর্কিত খবর